কোথাও যেতে পারলেন না মুরাদ

0

 

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিদ্বেষমূলক আক্রমণ ও ফাঁস হওয়া ফোনালাপে এক নায়িকাকে হুমকি দিয়ে আলোচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মুরাদ হাসান গত রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরে এসেছেন। এর আগে তিনি দুবাই হয়ে কানাডায় প্রবেশের ব্যর্থ চেষ্টা চালান। সেখান থেকে পুনরায় দুবাই এসে ভিসা নেওয়ার চেষ্টা করলে সেখানেও ব্যর্থ হন তিনি। এমনকি একাধিকবার দুই দেশের অভিবাসন কর্মকর্তাদের জেরার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। এদিকে মুরাদ হাসানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল বিকেলে বিমানবন্দর গোল চত্বরের সামনে একদল লোক প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন। কয়েকটি সূত্র বলছে, করোনার ডাবল ডোজ টিকার সনদ না থাকায় ডা. মুরাদ কানাডায় ঢুকতে পারেননি। এদিকে টিকার সনদ ও কভিড প্রটোকল না মেনে মুরাদ কীভাবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন তা নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা। এই নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম তৌহিদ-উল আহসান বলেছেন, বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে কারোর গাফিলতির প্রমাণ মিললে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত রবিবার সচিবালয়ে একটি অনুষ্ঠানে মুরাদের অবস্থান সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘তার সঙ্গে (মুরাদ) আমার কোনো যোগাযোগ নেই। সুতরাং আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’ বিমানবন্দরের সূত্রগুলো জানায়, গতকাল সন্ধ্য ৫টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন ডা. মুরাদ।  এই সময় পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা তার সামনে জড়ো হন। তাদের সহায়তায় তিনি ইমিগ্রেশন পার হন। মুরাদ হাসান বিমানবন্দরের ভিআইপি গেটের সামনে এলেও সাংবাদিকরা অপেক্ষা করছেন দেখে আবার ভেতরে চলে যান। পরে তিনি বিমানবন্দরের ভেতর দিয়ে ডমেস্টিক টার্মিনালে যান। সেখানে বাইরে তার জন্য অপেক্ষারত হোন্ডা সিআরভি ব্র্যান্ডের একটি গাড়িতে করে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে তিনি বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এয়ারপোর্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তিনি ভিআইপি গেইট ব্যবহার না করে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে গোপনে বেরিয়ে যান। এসময় তার মুখে মাস্ক, মাথায় ক্যাপ, গায়ে জ্যাকেট ছিল। হাতে ছিল লাল রংয়ের ট্রলি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে আগে থেকে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেট কারে করে তিনি উত্তরার দিকে চলে যান। তার আসার খবরে বিমানবন্দরে ভিআইপি গেটে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ভিড় করে। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ভিআইপি গেইট ব্যবহার করেননি। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে কানাডা যাওয়ার সময়ও তিনি মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। বিমান থেকে নামার পরই তার চোখেমুখে ছিল আতঙ্ক ও ক্লান্তির ছাপ। তিনি বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তার দেশে ফেরা নিয়ে পুরো বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম তৌহিদ-উল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে যে যাত্রীই বাইরের দেশে যান, সেসব বহির্গমন যাত্রীদের স্বাস্থ্য সনদ চেক করা, ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেট চেক করার দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নয়। আমরা ইমিগ্রেশন করি, যাত্রীদের সেবা দিই। ইমিগ্রেশন শাখা ইমিগ্রেশন করবে, স্বাস্থ্যের কাজ স্বাস্থ্য করবে। মুরাদসংক্রান্ত তথ্য জানতে হলে আপনাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করলে তারা ভালো উত্তর দিতে পারবেন। তারপরও আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। এই নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব। সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুবাই থেকে ৪ ঘণ্টা ২১ মিনিটের যাত্রা শেষে এমিরেটসের ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ডাক্তার মুরাদ এমিরেটস এয়ারলাইনসের ইকে ৫৮৬ ফ্লাইটটির বিজনেস ক্লাসে করে এসেছেন। ওই ফ্লাইটে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে তার ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট পরিবর্তন করেন তিনি। কানাডার পাশাপাশি দুবাই ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে একাধিকবার জেরা করেন। তার কাছে টিকার সনদ ও কভিড পরীক্ষার প্রতিবেদন ছিল না। এসব ছাড়াই তিনি শাহজালাল ত্যাগ করলেও কানাডায় ঢুকতে পারেননি। নানা বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রীর পদ হারান জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান। সমালোচনার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ইকে ৮৫৮৫-এ তিনি প্রথমে দুবাই যান, সেখান থেকে কানেক্টিং ফ্লাইটে কানাডার উদ্দেশে যাত্রা করেন। কানাডার টরন্টোর পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামার পর সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয় বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ)। কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের তীব্র আপত্তি ও ই-মেইলে অভিযোগ এলে কানাডীয় সরকার এমন সিদ্ধান্ত নেয় বলে কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। পরে মুরাদকে দুবাইগামী ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়। কয়েকটি সূত্র জানায়, করোনাভাইরাস সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার কারণেই মুরাদকে কানাডার ইমিগ্রেশন ফিরিয়ে দেয়। ইতিপূর্বে তার কানাডায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সফরের ভিসা ছিল। কানাডা থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর মুরাদ মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। দুবাইয়ের ইমিগ্রেশনও আটকে দেয় সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীকে। কানাডা থেকে ফিরে ডা. মুরাদ দুবাইতে এক দিন অবস্থান করেন। ওই দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে তিনি ভিসা নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। গ্রেপ্তারের দাবিতে বিমানবন্দর গোল চত্বরে বিক্ষোভ : ডা. মুরাদ হাসানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন গোলচত্বরের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন একদল মানুষ। রবিবার বিমানবন্দরের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে তাদের। নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ, অশালীন ও অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত মুরাদ দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারের দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় বিক্ষোভকারীরা মুরাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে বিমানবন্দর থানা পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা বলেন, মুরাদ হাসান আমাদের মা-বোনের ইজ্জত মানসম্মান নিয়ে কটূক্তি করেছেন। তার অনেক দুর্নীতি আছে। গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে। তিনি দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনে নামব আমরা। বিমানবন্দর থানার এসআই সাজ্জাদ শাকিল জানান, কিছু লোক সড়কে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিল। আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি। উল্লেখ্য, ফেইসবুক লাইভ টকশোতে নারীবিদ্বেষী বক্তব্য প্রদান এবং চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে অশ্লীল ভাষায় ধর্ষণের হুমকি প্রদানের অডিও ক্লিপ ফাঁস ও ভাইরাল হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ৭ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন মুরাদ হাসান।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.