চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানীদের হদিস নাই

0

ডেস্ক রিপোর্ট: স্বর্ণ চোরাচালানের বড় ঘাঁটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর। বিভিন্ন সময় বিমানের সিট-টয়লেট, লাগেজ, চার্জার লাইট, জুতাসহ যাত্রীর পেটের ভেতরেও মিলছে স্বর্ণ। সূত্র জানিয়েছে, একটি টিকিট বা কিছু টাকার বিনিময়ে স্বর্ণের চোরাচালান বহন করে নিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা। আর এ স্বর্ণ চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দীন বাজার ও খাতুনগঞ্জে প্রবেশ করছে, যা পাচারে সহায়তা করেন বিমানের পাইলট ও ক্রুরা। আবার রেয়াজুদ্দীন বাজার ও খাতুনগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা বা ফেনীর সীমান্তপথে এসব স্বর্ণের চালান চলে যাচ্ছে ভারত ও দেশের অন্যান্য জায়গায়। এদিকে শুল্ক গোয়েন্দারা মাঝেমধ্যে চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করে বাহকদের তুলে দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। মামলা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু চোরাচালানের মূলহোতারাই থেকে যাচ্ছে অধরা। বলা হয়, দেশে চোরাচালানের যত স্বর্ণ আসে তার প্রায় শতভাগই দুবাই ও সিঙ্গাপুর থেকে আসে। অথচ ওই দুই দেশ থেকে কারা চালান পাঠাচ্ছে আবার দেশে এই চালানের মূল রিসিভার কে তার হদিস মিলছে না। মূলহোতাদের ধরতে না পারার কারণে দিন দিন স্বর্ণ চোরাচালান বাড়ছে। কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে যেসব শ্রমিক কর্মহীন ও অর্থ সংকটে থাকেন তাদেরকে লোভ দেখিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও মূল হোতাদের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সূত্র আরও জানায়, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ও বাংলাদেশে এ চক্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। তবে এ চক্রটি একেবারেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। আর বাহককে স্বর্ণ বহনের বিনিময়ে দেয়া হয় যাতায়াতের টিকিট ও কিছু টাকা। বিমানে ওঠার আগে হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় চালান। এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এলে বিমানের নির্ধারিত স্থানে চালানের প্যাকেটটি রেখে বের হয়ে আসেন বাহক। পরে সিভিল এভিয়েশন, শুল্ক বিভাগ ও বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় চালান বের করা হয় বিমানবন্দরের বাইরে। বিমানবন্দরে প্রতি তোলা স্বর্ণের জন্য ঘুষ দিতে হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এরপর স্বর্ণ সিন্ডিকেটের কমিশন সদস্যদের সহায়তায় ওই চালান চলে যায় নির্ধারিত স্থানে। এরপরও যেসব স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে তা ফাঁকি দিয়ে পাচার বা উৎকোচ না দেয়ার কারণেই ধরা পড়ে। শুল্ক গোয়েন্দা তথ্যমতে, শাহ আমানত বিমানবন্দরে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় চালান জব্দ হয় ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ। ওই চালানে জব্দ ৯০২টি স্বর্ণের বারের ওজন ছিল ১০৫ কেজি ২০০ গ্রাম। যার বাজার মূল্য ৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। এই স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয় বিমানের ১০ যাত্রীকে। একই মাসে পৃথক আরেকটি চালানে আরও ৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালের পুরো বছরজুড়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ স্বর্ণ জব্দ করা হয়। যার পরিমাণ ২৫৪ কেজি। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় ২৫ জনকে। তাদের অধিকাংশই বহনকারী। এসব ঘটনায় মামলা হয় ২৪টি। এছাড়া, ২০১৫ সালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩২টি চালানে ১০৩ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২৩০ কেজি স্বর্ণের বার এবং সাড়ে ৬ কেজি স্বর্ণালঙ্কার জব্দ করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনায় আটক করা হয়েছে ৪০ জনকে। এর বাইরে পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দকৃত ১০০ কোটি টাকা মূল্যের আরও অন্তত ২০০ কেজি স্বর্ণের বার জিডি মূলে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ওই বছর স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় মামলা হয় ৩২টি। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। কিন্তু একটি মামলার তদন্তেও চিহ্নিত করা যায়নি মূলহোতাদের। ২০১৯ সালের ৪ মার্চ নগরীর সিআরবি থেকে সিএমপির ডিবি পুলিশ এবং জেলার জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ পৃথক দুটি চালানে ৭০০টি অবৈধ স্বর্ণের বার জব্দ করে। এসব স্বর্ণের বাজারমূল্য ৩১ কোটি টাকা। স্বর্ণ জব্দের সময় গ্রেপ্তার হওয়া কালু ও রাকিব কারাগারে রয়েছে। এ ঘটনায় সিএমপির কোতোয়ালি ও জোরারগঞ্জ থানায় পৃথক মামলা করা হয়। সর্বশেষ এ বছর ১৮ ডিসেম্বর সকালে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১০ কেজি ওজনের ৮৬টি স্বর্ণের বার জব্দ করে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা। এর আগে গত ২৩ নভেম্বর সকালে শাহ আমানত বিমানবন্দরে দুবাই থেকে ছেড়ে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের যাত্রীর কাছ থেকে ৪ কেজি ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দারা। জব্দকৃত স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা বলে শুল্ক অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় অবৈধ স্বর্ণের বার বহনকারী দুবাই ফেরত লোহাগাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেলকে। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করে সোহেলকে পতেঙ্গা থানায় হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও, গত ৯ অক্টোবর ৯ কেজি ২৮০ গ্রাম ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৮২টি স্বর্ণের বার ও ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কেজি ৪০০ গ্রাম ওজনের প্রায় ১০ কোটি টাকার স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কতিপয় কর্মচারী, বিভিন্ন বিমান সংস্থার ক্রু, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে ওই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে স্বর্ণের চাহিদা বছরে ১৬ থেকে ২৬ টন। কিন্তু এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি স্বর্ণ অবৈধ পথে দেশে আসছে। পাঁচটি স্বর্ণের চালান এলে ধরা পড়ে মাত্র একটি। অবৈধ পথে দেশে নিয়ে আসা এসব সোনার একটি বড় অংশ চলে যায় পাশের দেশে। যে কারণে দেশে স্বর্ণ চোরাচালান কমছে না। সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবদুর রউফ বলেন, চোরাচালান চক্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে না পারার কারণে স্বর্ণের চোরাচালান পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। স্বর্ণ, মাদক ও মুদ্রা পাচারের মত অপরাধগুলো আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। চোরাচালানের মূল হোতারা অবস্থান করে সিঙ্গাপুর, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মত মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। সেখানে বসেই মূলহোতারা স্বর্ণের চালানের যাত্রা থেকে গন্তব্যস্থল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের বিমানবন্দরে যারা ধরা পড়ে তারা বাহকমাত্র। এমনকি মূলহোতাকে তারা নিজেরাও চেনেন না। ফলে ভিনদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ চোরাকারবারিকে চিহ্নিত করা মুশকিল। তিনি আরও বলেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নাম জানা গেলেও তাদের যথাযথ ঠিকানা পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে ইন্টারপোল বা আন্তঃদেশীয় টাস্কফোর্সের মাধ্যমে চোলাচালান বা পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো তদন্তের পদক্ষেপ নিলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যেতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার উদ্যোগী হলে স্ব-স্ব দেশের পুলিশ সদস্যদের নিয়ে যৌথভাবেও এ ধরনের টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। সূত্র: বা. জা.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.