বন্ধু সাংবাদিক সাইমন ড্রিং আর নেই: প্রধানমন্ত্রীর শোক

0

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধু সাইমন ড্রিং চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে যে কজন বিদেশি সাংবাদিক বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসবে সাইমন ড্রিংয়ের নাম। গত শুক্রবার তলপেটে সার্জারি চলাকালে তিনি লন্ডনে মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফের রিপোর্টার ছিলেন সাইমন ড্রিং। বাংলাদেশের খারাপ পরিস্থিতি যখন চলছিলো তখন তিনি সাংবাদিকতা করছিলেন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে।‌ হঠাৎ একদিন লন্ডনের হেড কোয়ার্টার থেকে ফোন করে তাকে বলা হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সেখানে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তুমি ঢাকা যাও।’ সাইমন অনেক বছর ধরে সাংবাদিকতা করছিলেন লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম অঞ্চলে। কিন্তু পাকিস্তান কিংবা পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিলো না। তারপরেও তিনি মার্চের ৬ তারিখ কম্বোডিয়া থেকে ঢাকায় এসে পরদিন ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভা কাভার করেন। সেই ঐতিহাসিক দিনে তিনি ফুটেজও নিয়েছিলেন। এরপর সপ্তাহখানেকের জন্য সাইমন ড্রিং ঢাকা এসে আর ফিরে যেতে পারলেন না তিনি। পাকিস্তানের রাজনীতি, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আন্দোলন, সংগ্রাম সম্পর্কে তার জানাশোনার পরিধি বাড়লো। সে সময় বেশ কিছু বই পড়লেন তিনি। শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতার সঙ্গে তার পরিচয় হলো। এমনকি সম্পর্ক গড়ে উঠলো অনেকের সঙে। রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে তিনি নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাতেন লন্ডনে। ২৫শে মার্চ রাতে সাইমন ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। পাকিস্তানের সামরিক আইন উপেক্ষা করে ঝুঁকি নিয়ে ২৭শে মার্চ “ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান” শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পাঠিয়েছিলেন বিখ্যাত ডেইলি টেলিগ্রাফে। যা প্রকাশিত হয় ৩০ মার্চ। যে রিপোর্ট সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করলো। বিশেষ করে সে রিপোর্টের আলোকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশাল এক জনমত সৃষ্টি হয় পৃথিবীজুড়ে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় দু’শো বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সকল সাংবাদিককে হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় যাতে গণহত্যার কোন সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারে বিশ্ব গণমাধ্যম। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। পাকিস্তানী সামরিক আইন অমান্য করে সাইমন ড্রিং লুকিয়ে পড়েন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তার শ্বাসরুদ্ধকর ৩২ ঘন্টা সময় কাটে হোটেলের লবি, ছাদ, বার, কিচেন প্রভৃতি স্থানে। পরে তিনি ঘুরে ঘুরে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন গণহত্যার বাস্তব চিত্র। ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে সাইমন ড্রিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি প্রভৃতি স্থান প্রত্যক্ষভাবে ঘুরে দেখেন। মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে ব্রিটিশ হাই কমিশনের সহায়তায় ঢাকা ছাড়েন সাইমন। কিন্তু তাকে এয়ারপোর্টে নাজেহাল করা হয়।

এমনকি তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এতো নির্যাতনের পরেও তিনি দমে যাননি। বরং শক্ত হয়ে রিপোর্ট করেই গেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের। এমন একজন মানুষ এই সাইমন ড্রিং যিনি কেবল সাংবাদিকতার মধ্যেই আবদ্ধ থাকেননি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দাতব্য তহবিল দ্য রেস এসেইন্ট টাইম তার হাতেই গড়া। যেখানে ১৬০টি দেশের সাড়ে ৫ কোটিরও বেশী লোক স্বেচ্ছায় অর্থ দিয়েছেন। আরেকটি ছিলো “স্পোর্ট এইড” নামের আরকটি তহবিল। বিশ্বব্যাপী ১২০টি দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ এ তহবিলে দান করেছিলো। যা ব্যয় করা হয়েছিলো আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন স্টেশন একুশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরুর সময় সাইমন ড্রিংয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, তার হাত ধরে এ দেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতা নতুন মাত্রা পেয়েছিল। এজন্য তাকে বলা হয় বাংলাদেশে ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতার জনক। ১৯৯৭ সালে বিবিসি ছেড়ে তিনি একুশে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের বেসরকারী টেলিভিশনের আধুনিকতার অন্যতম রূপকার। ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশন সরকারের কথিত কর্তৃপক্ষ সম্প্রচার আইন লঙ্ঘনজনিত কারণে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয় এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তিনি ও তার সহযোগী তিনজন নির্বাহী পরিচালক প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তবে বলতে গেলে যা ছিলো পুরোপুরি ভুয়া! এরপর ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন বিএনপি সরকার সাইমন ড্রিংয়ের ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে তাকে অবিলম্বে বাংলাদেশ ত্যাগের আদেশ দেয়। ফলে তিনি ১ অক্টোবর, ২০০২ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
একজন ‘হিরো’: ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং বাংলাদেশের জনগণের কাছে একজন হিরো ছিলেন। তিনিই একমাত্র সাংবাদিক, যিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের ভয়াবহতা এবং নৃশংসতা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জঘন্য ও নৃশংসতার বিবরণ তুলে ধরেছিলেন বিশ্ব দরবারে। বাংলাদেশের সেই অকৃত্রিম বন্ধু সায়মন ড্রিং মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। গত শুক্রবার রুমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর এত দেরিতে কেন এল, সে নিয়ে কোনো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। ইতিহাস সাক্ষী; মুক্তিযুদ্ধে সায়মন ড্রিং-এর অবদান ভোলার নয়। তাকে বাংলাদেশ থেকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। ভারতে মার্ক টালি যেমন, সাইমন ড্রিং বাংলাদেশের কাছে সেরকমই একজন ছিলেন। সায়মন ড্রিং ছিলেন অকুতোভয় এবং মেধাবী একজন সাংবাদিক। তিনি বিবিসি, রয়টার্স, টেলিগ্রাফ ও ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করেছেন। সাফল্যর স্বীকৃতি হিসেবে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার-১৯৭১। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি গণহত্যার খবর বিবিসির মাধ্যমে সর্বপ্রথম তিনিই প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ঢাকা আসেন সায়মন ড্রিং। তবে ১৯৬৮ সালেও তার ঢাকায় আসার আরেকটি খবর রয়েছে। তিনি সে সময় কেন এসেছিলেন, তা অজানা। দ্বিতীয় দফায় ঢাকায় আসার পরদিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার সুযোগ হয় তার। মঞ্চের খুব কাছে দাঁড়িয়ে পুরো ভাষণ শুনেছিলেন তিনি। এরপর ঢাকায় বিভিন্ন কাজ করছিলেন। এভাবেই পার হয়ে যায় দুই সপ্তাহ। এসে যায় ২৫ মার্চ।
সায়মন ড্রিং-এর সেই বিখ্যাত রিপোর্ট তিনি জানতে পারেন পশ্চিম পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান কোনো সমঝোতা ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করছেন। আগের অভিজ্ঞতা থেকে সায়মন ধারণা করেন, ঢাকায় ভয়ঙ্কর কিছু হতে যাচ্ছে। এরইমধ্যে বিদেশি সব সাংবাদিককে একসঙ্গে করে রাখা হয় ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তাদের গার্ড দেয় পাকিস্তানের মিলিটারি বাহিনী। তার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। উপস্থিত সব সাংবাদিক জানতে পারেন, ঢাকায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে পাকিস্তানের সৈন্যরা। রাতেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের মেজর সালেক সিদ্দিকী নিরাপত্তার অজুহাতে সব বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। কিন্তু নিজ ইচ্ছায় বাংলাদেশে থেকে যান সায়মন। কিন্তু কীভাবে? হোটেলে বাঙালি কর্মচারীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে হোটেলেই লুকিয়ে পড়েন সায়মন। ৩২ ঘণ্টা সময় কাটান হোটেলের লবি, ছাদ, বার এবং কিচেনে। বাঙালি হোটেল বয়ের সাহায্যে হোটেল ছেড়ে বের হয়ে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (আগে নাম ছিল ইকবাল হক) যান সায়মন। সেখানে গিয়ে বিভীষিকাময় অধ্যায়ের মুখোমুখি হন তিনি। ছাত্রদের মরদেহ পুড়ছিল, অনেক মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। চারুকলা গিয়ে জানতে পারেন সেখানেও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। আশপাশের এলাকাগুলো ঘুরে চিত্র এবং তথ্য জোগাড় করতে থাকেন সায়মন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে গিয়ে দেখেন পাকিস্তানি সেনারা পতাকা উড়িয়ে রেখেছে এবং শত শত মরদেহ ট্রাকে তুলে নিচ্ছে। সব তথ্য সংগ্রহ করে একদিন পর ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় ঢাকা ছাড়েন সায়মন। কিন্তু তাকে এয়ারপোর্টে নাজেহাল করা হয়। পুরো তল্লাশি করে চেক করা হয় সঙ্গে কী নিয়ে যাচ্ছেন! তার ক্যামেরা নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। পায়ের মোজায় কাগজ লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ধরা পড়ে যান। এরপর তার পায়ুপথে লাঠি ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে তাকে পাকিস্তানের করাচিতে পাঠানোর চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তান গেলে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবেন না। তাই ব্যাংকক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যাংকক থেকে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রতিবেদন পাঠান ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে। ৩০ মার্চ তা প্রকাশিত হয়। এটাই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বহির্বিশ্বে প্রচারিত প্রথম সংবাদ। খবরটি ছাপা হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিদেশিদের টনক নড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত সৃষ্টিতে প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছিল। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও সন্ত্রস্ত এক নগর। পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠান্ডা মাথায় টানা ২৪ ঘণ্টা গোলাবর্ষণের পর এ নগরে অবশিষ্ট আর কিছু নেই।’ তার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একটি চিত্র সবার সামনে উঠে আসে এবং এরপরই পাকিস্তানকে চাপ দিতে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহল। তাই সায়মন ড্রিং বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তার সাহসী ভূমিকায় পুরো বাংলাদেশ আজও তার কাছে কৃতজ্ঞ। স্বাধীনতার পর কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন সায়মন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের মেজর সালেক সিদ্দিকী তার সঙ্গে আবার দেখা করেন। তখন তিনি জানতে চান, ২৫ মার্চ রাতে যদি তাকে পেত, তাহলে কী করা হত? সালেক সিদ্দিকী জানান, ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হত। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকা ফিরে আসার পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সায়মন ড্রিং। সেদিন সায়মনের জন্মদিন হওয়ায় বঙ্গবন্ধু কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.